Dearly beloved, part 4: মিথ্যুক

“Dearly beloved” is a series of love letters sent and received over a period of one hundred years.

13/01/2018

মুনিয়া,
পত্রের শুরুতেই দুঃখিত। আশা করছি এই ইংলিশ মিডিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আপনার বাংলা পড়ার গুনটি হারিয়ে যায় নি। কষ্ট করে পড়ে নেবেন।

মুনিয়া আমার বুকে ঘুমায়! প্রতিদিন রাতে আমি যখন মশারি টাঙ্গাই তখন টুকটুক করে সে আসে, আমার হাতে মাথা রাখে নইলে বুকের ওপর মাথা রাখে, ঘুমায়। ৮ তারিখ রাতে, আপনার আন্ধাপাট্টাভাবে করা বার্থডে উইশ নিয়ে ভাবছিলাম। এই সময় রিয়ালাইজ করলাম আমার আব্বু-আম্মা এই পিচ্চি বিড়ালটার নাম রাখসিলো মুনিয়া। আমি ডাকলাম, “মুনিয়া কই রইলা”; মুনিয়া উত্তর দেয় “মিউ মিউ, এই রইলাম।”

ইউনিভার্সের সারকাজম লেভেলটা দেখে আমি হাসি। রাত ২টা বাজে হা হা হো হো করে হাসি।

দুইটা ছবি দেই। দুই মুনিয়ার। প্রথম ছবিটা আমার মুনিয়ার। ঘুমায়।
দ্বিতীয় ছবিটা আমার বিয়ের দিনের ছবি। পালায় গেসিলাম তারে নিয়ে। অফিস বাংক করে, এক কাপড়ে, পকেটে আটশো টাকা নিয়ে। দুইটা সিঙ্গারা আর একটা পনেরো টাকার পানি দিয়ে লাঞ্চ করেছিলো সে। আমি একটা বিড়ি ফুকেছিলাম লুকায় লুকায়। কিচ্ছু দেয়ার ছিলো না, খালি ওয়াদা করেছিলাম, আজকের পর থেকে শুধু সুখ। যত ঝগড়াই হোক। আমি আসবো। 

তাঁর পরনে ছিলো সাধারণ অফিসের পোশাক, আমার গায়ে নিউমার্কেটের চাইনিজ জিন্স, বঙ্গবাজারের শার্ট আর শ্রীলেদারের জুতা। গাল ভর্তি বাজে দাড়িওয়ালা একটা বাজে মানুষ; আর পাশে বসা মানুষটার চোখে রাগ, ঠোটে কি অল্প একটু হাসি ছিলো? মনে নাই আমার। ছবিটা দেখে আসলেই মনে হতো দাড়িওয়ালার পাশে থাকার মত এই মানুষটার চাইতে পার্ফেক্ট আর কে আছে। 


ছবি দেখলে মনে হতো, কাজী বলছেন বাবাজী একটা সাইন করেন, এই সময় দাড়িওয়ালা একটা ভয়ানক লেম জোক মেরেছে, নিজের জোকে নিজেই ইমপ্রেসড। “…টিল ডেথ ডু আস পার্ট? কিন্তু আমার বউয়ের চোখের দিকে চাইলেই তো আমি মরে যাই…”, আর ওই পার্ফেক্ট মানুষটার চেহারায় এই “ইসসসসস এতো খ্যাত কেন মানুষটা” টাইপের এক্সপ্রেশন। 


আমি সত্যিই সবসময় বিশ্বাস করতাম। যত ঝগড়াই হোক আপনিও আসবেন। ওই যে ২৪৪১১৩৯ গানটার মত একটা ব্যাপার স্যাপার। আর কিছু দিন তারপর বেলা মুক্তি, কসবার ঐ নীল দেয়ালের ঘর, সাদা-কালো এই জঞ্জালে ভরা মিথ্যে কথার শহরে তোমার আমার লাল-নীল সংসার।


মন ভালো করা কিছু উপন্যাস পড়ছি ক’দিন ধরে, যার ফলাফল এই রাত তিনটা বাজে ড্রামা করা। এইসব ড্রামার কোনো মানেই হয় না। সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। 

তুমি করে বলি? তুমি করে বলছি। আবারো ক্ষমাপ্রার্থী।

মনে আছে একবার বাসের হেলপারকে কষে চড় মেরেছিলাম। তুমি বললা আপনি একটা স্টুপিড। বঙ্গদেশীয় রাস্তার ছেলে আমি, এই তুকতাক গালি গায়ে লাগে নাই। যাই হোক, পরশুদিন একটা মানুষকে প্রচুর মারধোর করেছি। মারতে মারতে টের পেলাম ব্যাপারটা আমি উপভোগ করি। কী সিক আমি? আমি অনেক ক্ষতি করেছি মুনিয়া, এই ক্ষতিগুলোর জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। নইলে এই ক্ষতিগুলো কর্মফল হয়ে যে মানুষগুলোকে ভালোবাসি তাদের ওপর হানা দেবে। স্ত্রী-সন্তান-মা-ভাই। এজন্যই হয়তো একা চলার পরিকল্পনা। যখন আমি ডুবে যাবো, একাই যেন ডুবি। আমার পাপগুলো যেন তোমাদের স্পর্শ না করে। তোমরা যেন কখনো না জানো আমি আসলে কে ছিলাম। কী ছিলাম। 

তোমাকে তুমি করে বলার একটা কারন আছে। তুমি করে বললে মানুষকে অনেক আপন মনে হয়। আমি বাপ-মা-দাদি-মামা-ফুপু কাউকে তুমি করে বলি না। তোমার ব্যাপারটা কিছুদিন আগে খেয়াল করেছি। তোমাকে আপন মনে হয় না।  আপন মনে হয় না দেখেই হয়তো বেশী বেশী তুমি করে বলা, যেন আপন মনে হয়। বৃথা চেষ্টা। একসময় কিন্তু মনে হত, যেদিন তাবাকের বিলটা তুমি দিলা। সেদিন অচেনা ছোট্ট মেয়েটাকে এত আপন মনে হয়েছিল। ফ্ল্যানেল প্রিন্টে ফ্যাক্যাশে নীলচে জামা আর চোখভর্তি বিষাদ। কী অসাধারণ শক্তিই না ছিল মেয়েটার ভেতর। মনে হচ্ছিল ফ্ল্যানেলের জামার হাতাটা দিয়ে কপালের ঘামে একটা ঘষা দিলেই সব মুছে যাবে। যত “কর্মফল” জীবনের, এক ঘষাতেই মাফ। ব্যাপারটা কেমন জানি, একটা নক্ষত্রের ভেতর যদি একটা সিঙ্গুল্যারিটিকে লুকিয়ে রাখা হয় তাহলে হয়তো সে ফ্ল্যানেল জামার মেয়েটার মত দেখতে হবে। 


এই রাত তিনটা বাজে  এইসব ড্রামার কোনো মানেই হয় না। সেজন্য আবারো ক্ষমাপ্রার্থী।  

এখন যে মানুষটা তাকে আমি চিনি না। কতটা বদলে গিয়েছো? এখন তোমাকে দেখলে মনে হয় আলফা সেন্টরী টাইপের কোনো তারার দিকে তাকিয়ে আছি।

যাই হোক, আমি কামলা মানুষ, দেখবা মসলিনের বাজে শাড়ি আজাইরা পয়সা খরচ করে আনবো, 
“এইটা কি কিনসেন ফালতু জিনিষ?” 
“কেন ফালতু কেন, মসলিনের তো অনেক নামডাক”, 
“ফালতুই তো, দেখসেন কত পাতলা?”, 
“তাহলে তো ভালো হল, খালি আমার সামনেই এই শাড়ী পড়বা” এরপর আমি হে হে করে বিশ্রী একটা হাসি দিব।
দেখেছো? স্বপ্নেও তোমাকে আপন মনে হয় না। প্রথম দিন লেগেছিলো। ফ্ল্যানেল মার্কা জামা পড়া ছোট্ট আগুনের টুকরা মেয়েটা।


হয়তো ভালোবাসিও না। জেদ করে একে অপরের পাশে বসে আছি। নাকি ইউনিভার্স গাধাটার সাজানো নাটক এসব। তোমাকে প্রশ্ন করি, “কোনোদিন কি সুখী করতে পেরেছি আমি?” উত্তর এলো “না”। প্রশ্ন করি ঘর বাধবে আমার সাথে? উত্তর এলো না। প্রশ্ন করি আমাকে কি ভালোবাসো? উত্তর এলো না। ভেবে দেখলাম তোমাকে কখনই হয়তো সুখী করতে পারবো না। এজন্যই হয়তো থামা। 


যেদিন বললা, “এই মুহুর্তে আপনি কী করছেন এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর ভাবি না” সেদিন এত কষ্ট পেয়েছিলাম। আমার জন্য না, তোমার জন্য। আমাকে জোর করে ভুলে যেতে হয়েছে তোমার। কত ফাঁকা বুলি আওরেছিলাম। তুমি সেজে বসেছিলা, আমি আসি নি। এই যে নামাজ পড়ে দোয়া কর, এইযে এত কিছুর পরে এসে জিজ্ঞেস কর “এখানে বসে থাকবেন নাকি? যাবেন না?” এ জিনিষগুলা তোমাতে আমাতে আর মানায় না।তোমার পাশে আমাকে মানায় না। তোমাকে মানায় কোনো ৬ ফিট লম্বা সুদর্শন ব্যাট ডিরেক্টরের ঘরে, ছুটির দিনে রান্না করে গেস্ট খাওয়াবে। ব্যাট ডিরেক্টর গেস্টদের ফোন দিয়ে বলবে “টাইম মত চলে আসিস, মুনিয়া দেরী করে আসা গেস্ট পছন্দ করে না।”  


যদি পত্রখানি না পড়ে একটানে এখানে চলে আসো, তাহলে একখানি শানে নুজুল দেই। একটি গাধা মানুষ কিছু বাজে কথা লিখে রেখেছে। ইচ্ছা ছিলো এই ব্যাপারটা সেমিস্টার ব্রেকের আগে করার। যেন দেখা না হয়, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তুমি বিশাল বড় মাপের একজন, এইসব তুচ্ছ বিরহ তোমার গায়ে লাগবে না। তোমাদের স্কুলের বাচ্চাগুলোর খরচটা আশা করছি কাল-পরশুর মধ্যে দিয়ে দিবো। এই খরচটাকে দয়া করে কোনো নামে ডাকবেন না। মনে করেন, যে রাস্তায় একমুঠো ধুলো কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। ধুলোগুলো…


আমি যাই। ছবিটা ডিলিট করে দিয়েন। আমিও করে দিচ্ছি। বেশী লেখার জন্য দুঃখিত। আজকাল অনেক বেশী লিখে ফেলি। অভ্যাসটা ত্যাগ করার সর্বোপরি প্রচেষ্টা চলছে। কারন বেশী লেখালিখি করা ভালো না। ভেতরের মানুষটা লেখক হয় যায়, আর আমরা সবাই জানি লেখকরা মিথ্যুক হয়। 

বিনীত
একটি ছোট্ট টিলা

© instagram/@__shadhin

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s